দেশের শিক্ষা খাতে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি…

বাংলা নিউজ ইউকে ডটকমঃ দেশের শিক্ষা খাতে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে। সরকার প্রণীত “শিক্ষা নীতি ২০০০”-এর আলোকে ২০০৯ সাল থেকে শিক্ষার বিভিন্ন শাখায় এসব কার্যক্রম বাস্তবায়ন শুরু করে।

এর মধ্যে রয়েছে শিক্ষার মৌলিক উপকরণ নিশ্চিতকরণ, শ্রেণীকক্ষ ও পাঠ্যবইয়ের ডিজিটাইজেশন, পাঠ্যসূচির সংস্কার, সৃজনশীল প্রশ্নপত্র প্রবর্তন,অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং মাদ্রাসা শিক্ষার আধুনিকায়ন।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, “শিক্ষা নীতি ২০০০” বাস্তবায়নের ফলেই শিক্ষার বিভিন্ন শাখায় এ অগ্রগতি সম্ভব হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকার ২০০০ সালে এই শিক্ষা নীতি প্রণয়ন করে।

পরবর্তীতে বিএনপি ক্ষমতায় এসে এ নীতিকে বাতিল করে দেয়। কিন্তু আওয়ামী লীগ পুনরায় সরকার গঠন করলে ২০০৯ সালে এ নীতির পূন:প্রবর্তন এবং বাস্তবায়ন শুরু হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, “এ নীতির মূল লক্ষ্য হলো নতুন প্রজন্ম তৈরিতে সহায়তা করা, শিক্ষাকে সমৃদ্ধ করা, নৈতিক মানসম্পন্ন জ্ঞান ও মেধার বিকাশ, জনগণের প্রতি ভালোবাসা এবং দেশ প্রেম শিক্ষা দেয়া।”

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, একটি শিশুও যাতে শিক্ষার মৌলিক সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হয় সে লক্ষ্যে সরকার ২০১০ সাল থেকে বছরের প্রথম দিন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের হাতে বিনামূল্যে পাঠ্যবই তুলে দেয়। এর আগে মাত্র ৪০ শতাংশ শিক্ষার্থীর মাঝে বিনামূল্যে পাঠ্যবই বিতরণ করা হতো। আর ৬০ শতাংশ শিক্ষার্থীই পুরনো বই পেত অথবা বাজার থেকে নতুন বই কেনার অপেক্ষায় থাকতো। কিন্তুু মার্চ এপ্রিলের আগে বাজারে নতুন বই পাওয়া যেত না।

দেশের সব জায়গায় একই সময়ে পাঠ্যবই প্রাপ্তি নিশ্চিত করার জন্য সরকার ২০১০ সালে প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের জন্য ই-বুক চালু করে এবং সেগুলো ওয়েবসাইটে আপলোড করে।

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) শিক্ষা প্রসারের অংশ হিসেবে দেশের ২৩ হাজার ৩৩১ টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং ১৫ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব এবং মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম চালু করা হয়েছে।

২০১৩ সাল পর্যন্ত প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শ্রেণীতে ১৯৯৫ সালে রচিত পাঠ্যবই পড়ানো হতো। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ১হাজার ৪০০ জন শিক্ষাবিদ, গবেষক ও শিক্ষকদের সমন্বিত প্রচেষ্টায় একটি আধূনিক ও সময়োপযোগী পাঠ্যসূচি প্রণয়ন করে।

শিক্ষার্থীরা যাতে প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর খোঁজার জন্য বিষয়ের গভীরে প্রবেশ করতে বাধ্য হয় সেজন্য সরকার মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় সৃজনশীল প্রশ্নপত্র চালু করে।

শিক্ষার প্রসার ও সবার জন্য শিক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সরকার ১ হাজার ৫০০ টি বেসরকারি কলেজ, ৩ হাজার বেসরকারি বিদ্যালয় এবং ১হাজার মাদ্রাসা নির্মাণের কাজ শুরু করেছে। শিক্ষার মানোন্নয়নে গৃহিত প্রকল্পের অধীনে ২০১১ সাল থেকে প্রত্যেক জেলায় কমপক্ষে একটি স্নাতকোত্তর কলেজে একটি কম্পিউটার ল্যাব, একটি উপযুক্ত পরীক্ষা কেন্দ্র, একটি ডরমেটরি ও একটি সায়েন্সল্যাব স্থাপনের কাজ শুরু করে।

মাধ্যমিক পর্যায়ে উপজেলা আইসিটি ট্রেনিং ও রিসোর্স সেন্টার স্থাপন করা হয়েছে এবং ২৯৫টি বেসরকারি বিদ্যালয়কে মডেল বিদ্যালয়ে রূপান্তর করা হয়। গত কয়েক বছরে অতিরিক্ত ২৬ হাজার ১৯৩ টি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে জাতীয়করণ করায় এখন দেশের প্রায় প্রত্যেক গ্রামে কমপক্ষে একটি করে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে।

প্রতিবছর ষ্ষ্ঠ থেকে স্নাতক এবং এর সমমানের ৩৮ লাখ শিক্ষার্থীকে বৃত্তি এবং ৬’শ ৭৫ কোটি টাকা মূল্যের অন্যান্য শিক্ষা সহায়তা দেয়া হয়। এছাড়াও প্রান্তিক শিক্ষার্থীদের মৌলিক শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ২৯ লাখ অসহায় শিক্ষার্থীকে বৃত্তি দেয়া হয়।

গত মে মাসে শিক্ষা মন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেছিলেন, সরকার এ বছর ৬ লাখ শিক্ষার্থী বিশেষ করে যেসব মেয়ে দারিদ্র্যের কারণে লেখাপড়া চালিয়ে যেতে পারেনা তাদের বৃত্তি দেবে।

মাদ্রাসা শিক্ষার আধুনিকায়নের জন্য সরকার দেশে ৭৮৩ কোটি টাকা ব্যয়ে ১ হাজার মাদ্রাসা নির্মাণের কাজ শুরু করেছে। একশ’ মাদ্রাসায় কম্পিউটার ল্যাব এবং ডিজিটাল ক্লাসরুম চালুর পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষা কোর্সও চালু করেছে।

শিক্ষার বিভিন্ন শাখায় অগ্রগতির ফলে বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থী নিবন্ধনের হার বেড়েছে, মেয়েদের এবং প্রাপ্ত বয়স্কদের ঝরে পড়ার হার কমেছে।

বাংলাদেশ ব্যুরো অব এডুকেশনাল ইনফরমেশন এ্যান্ড স্ট্যাটিসটিকস (ব্যানবেইস)-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৬ সালে মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থী নিবন্ধনের হার ৬৭.৮৪ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। যার মধ্যে ৭৩.১০ শতাংশ মেয়ে এবং ৬৩.৮৫ শতাংশ ছেলে।

প্রাথমিক শিক্ষায় ঝরে পড়ার হার ২০১৫ সালের ২০.৪ শতাংশ থেকে ২০১৬ সালে কমে ১৯.২ শতাংশ হয়েছে। একইভাবে মাধ্যমিক পর্যায়ে ঝরে পড়ার হার ২০১৫ সালের ৪০.২৯ শতাংশ থেকে ২০১৬ সালে ৩৮.৩ শতাংশে নেমেছে। উচ্চ মাধ্যমিকে ঝরে পড়ার হারও ২০.০৮ শতাংশে নেমে এসেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী মাধ্যমিক পর্যায়ে দেশের শিক্ষার্থীর ৫১.৯ ভাগ মেয়ে। যা ই-৯ভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। ই-৯ভুক্ত অন্যান্য দেশগুলো হলো ব্রাজিল, চীন, মিসর, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, মেক্সিকো, নাইজেরিয়া ও পাকিস্তান।

বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, “সহশ্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্য ২০১৫-এর অনেক আগেই বাংলাদেশ প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় লিঙ্গ সমতা অর্জন করেছে।”

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, প্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার হার ১২ বছরের মধ্যে গতবছর সর্বোচ্চ ৭২.৩ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।

শেয়ার করুন