হলি আর্টিজানের পুনরাবৃত্তি চাই না :: মেজর জেনারেল এ কে মোহাম্মদ আলী শিকদার (অব.)

বাংলা নিউজ ইউকে ডটকমঃ চন্দ্র-সূর্যের পথচলার মধ্য দিয়ে ১ জুলাই আবার ফিরে এসেছে এবং পৃথিবী যত দিন থাকবে তত দিন বছরান্তে একই রকম অগণিত ১ জুলাই আসবে। তবে গত এক বছর বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষ, আমি বিশ্বাস করি, মনেপ্রাণে সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করেছে যাতে ২০১৬ সালের ১ জুলাইয়ের মতো আরেকটি দিন আমাদের মধ্যে আর কখনো ফিরে না আসে। কারণ বিভীষিকা আর বীভৎসতায় সেদিন আমরা অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলাম। জাতির কপালে নতুন করে আরেকটি কলঙ্কের তিলক পড়েছে, যেমনটি হয়েছিল ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট, ৩ ও ৭ নভেম্বর এবং পরে এসে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট। তবে ওই সব পুরনো ঘটনার কথায় আজ যাব না; যদিও আমি দৃঢ়ভাবে বলতে চাই, ২০১৬ সালের ১ জুলাই যা ঘটেছে তার সঙ্গে অবশ্যই কোনো না কোনোভাবে বিগত দিনের ওই কলঙ্কিত ঘটনাবলির যোগসূত্র ও সংযোগ রয়েছে। এগুলোর কোনোটাকেই আমার কাছে বিচ্ছিন্ন ঘটনা মনে হয় না। বাংলাদেশে এর বীজ রোপিত হয়েছে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের রাতে। এরপর বহু ঘটনার ধারাবাহিকতায়, যার চরম বাড়ন্ত জানোয়ারি চেহারা ও বীভৎস চিত্র আমাদের দেখতে হয়েছে ২০১৬ সালের ১ জুলাই। এরই মধ্যে এক বছর পেরিয়ে গেছে।

সময় দ্রুত চলে গেলেও সেদিনের সেই ভয়ংকর স্মৃতির দুঃসহ যন্ত্রণা ও বেদনা আমাদের তাড়িয়ে ফিরছে সর্বক্ষণ। এত বড় যন্ত্রণার বোঝা থেকে কখন আমরা মুক্ত হতে পারব তার নিশানা এখনো দৃষ্টির ভেতরে আসছে না। অজান্তে প্রায়ই ভাবনা এসে আচ্ছন্ন করে, কী জানি আবার এর থেকেও বড় কিছু তারা করে ফেলে কি না! কারণ এই দুর্বৃত্তদের মানবতা, বিবেক, ধর্ম—কিছুই নেই। পরিবার-পরিজন, মা-বাবা, সন্তান-সন্ততি কারো প্রতি তাদের সামান্য মায়া-মমতা নেই। এরা স্রেফ অন্ধ ও পাগল। তাদের ভয়ংকর পশুত্বে পেয়ে বসেছে। তা না হলে পবিত্র রমজান মাসে নামাজ-তারাবি বাদ দিয়ে কী করে এত নিরীহ, নিরপরাধ মানুষকে তারা হত্যা করতে পারে? ১ জুলাই ২০১৬ মোতাবেক ২৫ রমজান, হিজরি ১৪৩৭ বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ মানুষ রমজানের এশা-তারাবি পড়ার জন্য কেউ বা মসজিদে আবার কেউ বা মসজিদের পথে। এমন সময় টেলিভিশনের মাধ্যমে ও সোশ্যাল মিডিয়ায় খবর ছড়িয়ে পড়ে ঢাকার গুলশানের হলি আর্টিজান নামের এক রেস্টুরেন্টে জঙ্গিরা আক্রমণ চালিয়ে সেখানে আহার করতে আসা দেশি-বিদেশি মানুষদের হত্যা করেছে। পরে সব কিছু জানা যায়। দুজন পুলিশ সদস্য, তিনজন বাংলাদেশি নাগরিক ও ১৭ জন বিদেশি নিরীহ মানুষকে ওই দিন জঙ্গিরা হত্যা করে। প্রথমবারের মতো এতসংখ্যক বিদেশির রক্তে রঞ্জিত হয় বাংলাদেশের মাটি, যে দেশের অতিথিপরায়ণতার সুনাম বিশ্বব্যাপী সুবিদিত। বিদেশি নাগরিকদের মধ্যে বেশির ভাগই ব্যবসা-বাণিজ্য ও বাংলাদেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিল। গুলশানের রক্ত শুকানোর আগেই ৭ জুলাই, ১ শাওয়াল ইসলাম ধর্মের সর্বশ্রেষ্ঠ পবিত্র উৎসব ঈদুল ফিতরের দিনে দেশের সর্ববৃহৎ ঈদের জামাত কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় মুসল্লিদের ওপর ওই একই জঙ্গিগোষ্ঠী আক্রমণ চালাতে যায়। তাদের প্রতিহত করতে গিয়ে দুজন পুলিশ সদস্য ও একজন নারী হামলার শিকার হয়ে নিহত হন। পুলিশের পাল্টা গুলিতে একজন জঙ্গিও নিহত হয়।

গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় ও শোলাকিয়ার ঈদগাহ মাঠের কাছে জঙ্গিদের আক্রমণের মধ্য দিয়ে তাদের একটি নতুন পরিচয় ও ক্ষেত্র মানুষের কাছে উন্মোচিত হয়। জঙ্গিরা মাদরাসাপড়ুয়া অর্ধশিক্ষিত অবুঝ বিপথগামী তরুণ, এই গতানুগতিক ভ্রান্ত চিন্তার অবসান ঘটে। গুলশান ও শোলাকিয়ার আক্রমণে জড়িত জঙ্গিদের প্রায় সবাই উচ্চশিক্ষিত এবং অবস্থাসম্পন্ন পরিবারের সন্তান। গত এক বছরে বিষয়টি আরো উন্মোচিত ও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। জানা যায়, এসব শিক্ষিত তরুণের বেশির ভাগই পরিবারের অজ্ঞাতসারেই জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। গুলশানের ঘটনায় জঙ্গিরা মৃত্যুর আগে নিজেদের দাঁত বের করা কৃত্রিম হাস্যোজ্জ্বল মুখচ্ছবি নিজেরাই সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেয়, যার মাধ্যমে বোঝা যায়, এদের মগজ ধোলাইয়ের প্রক্রিয়া ও মাত্রাটা অতি উচ্চমানের, যেটি করা হয়েছে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সুসংগঠিত পন্থায়। শক্তিশালী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক ছাড়া তা সম্ভব নয়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের গণহত্যার প্রধান আসামি পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের এ রকম বিকৃত হাসির দন্ত দেখে শিল্পী কামরুল হাসান এঁকেছিলেন সেই বিখ্যাত ছবি, যার নিচে লেখা ছিল, ‘আসুন, এই জানোয়ারদের আমরা হত্যা করি’।

গুলশান ঘটনার এক বছরের মাথায় এসে আমরা কী দেখতে পাচ্ছি এবং ভবিষ্যতের দিকে তাকালে কী দেখতে পাই, সেটাই এখন চিন্তা ও বিচার-বিশ্লেষণের বিষয়। এ কথা স্বীকার করতে হবে, জঙ্গি দমন ও নিয়ন্ত্রণে গত এক বছরে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রশংসনীয় সাফল্য দেখাতে সক্ষম হয়েছে। এ সাফল্যের পেছনে বাহিনীগুলোর কৌশল কী ছিল সেটা গোপনীয় বিষয়। তবে মানুষের মধ্যে একটা বিশ্বাস জন্মেছে, সামগ্রিকভাবে পুলিশ বাহিনী চাইলে মানুষের প্রত্যাশা তারা পূরণ করতে পারে, সেটি তারা প্রমাণও করেছে। মানুষের এই আস্থার মাত্রা পুলিশ বাহিনী যত বৃদ্ধি করতে পারবে ততই তাদের সামগ্রিক সাফল্যের মাত্রা বৃদ্ধি পাবে। এখান থেকে তাদের যেন আবার অবনতি না ঘটে তার জন্য যত চ্যালেঞ্জই থাকুক না কেন, সেগুলোকে পুলিশ বাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্বকে সাহসের সঙ্গে গ্রহণ করতে হবে। এর সঙ্গে তাদের মর্যাদা ও অঙ্গীকারের প্রশ্ন জড়িত। একই সঙ্গে যে কথাটি জোর দিয়ে বলতে চাই তা হলো, নিকট ভবিষ্যতে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে জঙ্গিদের বংশবৃদ্ধি, বিস্তার ও তত্পরতা বাড়বে বৈ কমবে না। সুতরাং আত্মতুষ্টির কোনো সুযোগ নেই। সবাইকে মনে রাখতে হবে, আক্রমণের সব গোয়েন্দা তথ্য আগাম পাওয়ার পরও এবং সব প্রস্তুতি থাকা সত্ত্বেও বছর দেড়েক আগে বেলজিয়ামের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সর্বোচ্চ নিরাপত্তাবেষ্টনীর ভেতরে ঢুকে জঙ্গিরা হামলা চালাতে সক্ষম হয়।

অবাধ ও সীমাহীন মুক্ত সাইবারজগতের কল্যাণে যেকোনো প্রযুক্তি ও কৌশল এক গোষ্ঠীর কাছ থেকে পৃথিবীর অন্য গোষ্ঠীর প্রাপ্তিতে কোনো বাধা নেই। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় অগ্রগতির আশীর্বাদ ও অভিশাপ দুটিকেই আমাদের মাথায় রাখতে হবে। বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন সামনে—এ কথাটিও স্মরণে রাখা গুরুত্বপূর্ণ। যতই তারা ধর্মের দোহাই দিক না কেন, বাংলাদেশের জঙ্গিদের শিকড় দেশের ভেতরে ও বাইরে কোথায় এখন সেটি আর কারো অজানা নয়। জঙ্গি ও তাদের রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকদের সম্মিলিত একটি লক্ষ্য হলো, বর্তমানে ক্ষমতায় থাকা মুক্তিযুদ্ধের দর্শনের রাজনৈতিক পক্ষকে উত্খাত করা। এ কারণেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত নিরাপত্তার বিষয়টি সব সময়ই ঝুঁকির মধ্যে আছে, ভবিষ্যতে তা আরো বৃদ্ধি পাবে। ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের কথা ভুলে যাওয়ার কোনো কারণ নেই। চারদিকে অস্ত্রের ঝনঝনানি দেখতে পাচ্ছি। রাজধানীর উপকণ্ঠে বিপুল পরিমাণ ব্যবহারোপযোগী অস্ত্র যারাই এনে জড়ো করছে তাদের সঙ্গে জঙ্গিদের সংযোগ ও সম্পর্কের কথাটি গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে। তাদের অর্থের জোগান এখনো বহুমুখী পন্থায় চলছে।

হলি আর্টিজান ঘটনার পর গত এক বছরে মানুষের মধ্যে জঙ্গিবিরোধী সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এটা ইতিবাচক দিক; যার জন্য আমরা দেখতে পাই, জঙ্গিদের মৃতদেহ তাদের স্বজনরাও গ্রহণ করছে না, প্রকাশ্যে ঘৃণা প্রকাশ করছে। এই ধারা অব্যাহত রাখতে হবে। মিডিয়া এ ব্যাপারে প্রশংসনীয় ভূমিকা রেখেছে। তবে এ ক্ষেত্রে কাজ করার মতো আরো অনেক সুযোগ আছে। এ সম্পর্কে সাংস্কৃতিক অঙ্গন ও মিডিয়ার যৌথ উদ্যোগের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। দেশের নিরাপত্তাব্যবস্থা, বিশেষ করে জঙ্গিদের পক্ষ থেকে হুমকির মাত্রা যদি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকে, তাহলে মিডিয়ার মালিকদের অন্যান্য ব্যবসার উন্নতি ও বিস্তারের বিশাল সম্ভাবনা ভবিষ্যতে আরো বৃদ্ধি পাবে। আর জঙ্গি হুমকি নিয়ন্ত্রণে না থাকলে যতটুকু আছে তা-ও হারানোর আশঙ্কা রয়েছে। দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি তো আছেই, তার সঙ্গে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির খেলা ও আধিপত্য বিস্তারের দ্বন্দ্বের কারণে জঙ্গিবাদের কবল থেকে আমরা সহজে মুক্তি পাচ্ছি না। তাই এটি কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য সাময়িক ব্যবস্থার সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও তার বাস্তবায়ন শুরু করা দরকার। বিচারপ্রক্রিয়ার দুর্বলতায় শত শত জঙ্গি জামিন পেয়ে আবারও জঙ্গি তত্পরতায় ফিরে যাচ্ছে। এটা রোধ করা জরুরি। গত বছরের ১ জুলাই জঙ্গি আক্রমণে যাঁরা নিহত হয়েছেন তাঁদের প্রতি অশেষ শ্রদ্ধা।

লেখক : কলামিস্ট ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক

শেয়ার করুন