সেই খাদিজা এখন কেমন আছেন, সেই বদরুল ? (ভিডিও সহ)

বাংলা নিউজ ইউকে ডটকমঃ খাদিজা বেগম নার্গিস সুস্থ হয়ে ২৪ ফেব্রুয়ারি বাড়ি ফিরে গেলেও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারছে না। জেলে বসেই হুমকি দিয়ে যাচ্ছেন সিলেট শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের নেতা বদরুল আলম। হুমকির কারণে বন্ধ করে দিতে হয়েছে কলেজে যাওয়া।

২০১৬ সালের ৩ অক্টোবর এমসি কলেজ কেন্দ্রে পরীক্ষা দিয়ে বের হওয়ার পর হামলার শিকার হন সিলেট সরকারি মহিলা কলেজের স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী খাদিজা বেগম নার্গিস। প্রকাশ্যে তাকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে জখম করা হয়।

রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে দীর্ঘ চিকিৎসা শেষে সিআরপিতে স্থানান্তর করা হয়।  সেখানে পুনর্বাসন প্রক্রিয়া শেষ করে বাড়ি ফেরেন খাদিজা।সুস্থ হয়ে আবার কলেজ যাওয়া শুরু করলেও তা বেশিদিন চালিয়ে যেতে পারেনি খাদিজা। কিছু দিন যেতেই নানা ভাবে হুমকি দিতে থাকে  বদরুলের লোকজন। ফলে নিরাপত্তার কথা ভেবে কলেজে যাওয়া বন্ধ করে দিতে হয় তাকে।

খাদিজার চাচা আব্দুল কুদ্দুস জানান,বদরুলের আপন ভাই নুরুল খাদিজা ও তার পরিবারের সদস্যদের প্রায় হুমকিধামকি দেয়। নুরুল সবাইকে বলে বেড়াই, ‘তার ভাই বদরুলের সঙ্গে অন্যায় করেছে খাদিজার পরিবার। এজন্য খাদিজার পরিবারকে দেখে নেওয়া হবে’।

খাদিজা সাথে কথা হলে তিনি জানান, ‘এখন অনেকটা সুস্থবোধ করেন। কিন্তু পা ও হাতে সমস্যা রয়ে গেছে।’আলাপের এক পর্যায়ে নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তাহীনতার কথা জানান তিনি। তাদের আশঙ্কা, যেকোনো সময় বদরুল তার লোক দিয়ে হামলা চালাতে পারেন। এজন্য কলেজে যাওয়া বন্ধ রয়েছে।

তিনি আরও বলেন,‘বিভিন্ন মাধ্যমে বদরুল শেষ দেখে নেওয়ার হুমকি দেন। ফলে পড়ালেখার ইচ্ছা থাকলেও ভয়ে ঘর থেকে বের হতে পারছি না।’নৃশংস হামলার আগে থেকেই বদরুল হুমকি দিয়ে আসছিলেন জানিয়ে খাদিজা বলেন, ‘সত্যিই যে আমার জীবনে এমন ঘটনা ঘটবে স্বপ্নেও ভাবিনি।’

তবে আদালতের মাধ্যমে বদরুলের সাজা হওয়ায় খাদিজা সন্তুষ্ট বলে জানান। এখন তিনি তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে পড়ালেখা শেষ করে ব্যাংকার হওয়ার স্বপ্ন বুনছেন।

খাদিজার বড় ভাই শাহানুর হক শাহিন বলেন,‘আমরা বাড়িতে খাদিজাকে সাধ্যমত নিরাপদে রাখার চেষ্টা করছি। কিন্তু,বদরুল ও তার পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে বিভিন্ন মাধ্যমে হুমকি আসছে।’ এই হুমকির বিষয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করার কথা ভাবছেন পরিবার।

তিনি বলেন, ‘জেলে বদরুলের সঙ্গে যার পরিচয় হয়, তাকেই নাকি বলেন- একবার জেল থেকে বের হতে পারলে খাদিজার শেষ দেখে নেব। জেল থেকে কেউ বের হলে তাদের বদরুল অনুরোধ করেন যেন এই হুমকির বার্তা খাদিজার পরিবারকে পৌঁছে দেওয়া হয়।’

খাদিজার চিকিৎসার বিষয়ে বড় ভাই শাহিন জানান, চলতি সপ্তাহেই ঢাকা আসবে খাদিজা। তার হাতে আরও একটা অস্ত্রোপচার করা হবে।

তিনি বলেন, ‘বদরুলের যে সাজা হয়েছে, তাতে আমরা খুশি। হাইকোর্ট এবং আপিল বিভাগেও যেন তার এই সাজা বহাল থাকে।’

উল্লেখ্য,২০১৬ সালের ৩ অক্টোবরে এমসি কলেজে স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষের পরীক্ষা দিতে গিয়েছিলেন সিলেট সরকারি মহিলা কলেজের শিক্ষার্থী খাদিজা বেগম নার্গিস।

পরীক্ষা দিয়ে বের হওয়ার পর পথে প্রকাশ্যে তাকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর জখম করেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী ও ছাত্রলীগ নেতা বদরুল আলম।

খাদিজাকে মাঠের মধ্যে ফেলে চাপাতি দিয়ে নৃশংসভাবে বদরুলের কোপানোর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে সমালোচনার ঝড় ওঠে।

এরপর সারাদেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ এ ঘটনার বিচার চেয়ে আন্দোলন শুরু করেন।

ঘটনার সময় স্থানীয়রা বদরুলকে ধরে গণধোলাই দেন। পরে শাহপরান থানায় তাকে সোপর্দ করা হয়।

এ ঘটনায় খাদিজার চাচা আব্দুল কুদ্দুস বাদী হয়ে ওই থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। পরে ওই মামলায় বদরুলকে গ্রেপ্তার দেখায় পুলিশ।

দীর্ঘ তদন্ত শেষে পুলিশ ২০১৬ সালের ৮ নভেম্বর আদালতে চার্জশিট দেয়। এরপর ২০১৭ সালের ৮ মার্চ সিলেট মহানগর দায়রা জজ আদালত বদরুলকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ দেন।

বদরুল এখন কারাগারে আছেন। তবে এখনো তিনি রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করেননি।

২৬ ফেব্রুয়ারি সিলেটের মুখ্য মহানগর হাকিম (সিএমএম) আদালতে সাক্ষ্য গ্রহণ

খাদিজা সুস্থ হয়ে ২৪ ফেব্রুয়ারি বাড়ি ফিরে গেলে ২৬ তারিখে  মুখ্য মহানগর হাকিম (সিএমএম) আদালতে  জবানবন্দী দিতে হাজির হয়। বিচারক সাইফুজ্জামান হিরোর আদালতে খাদিজা সাক্ষ্য গ্রহণের সময় চিৎকার করে বদরুল বলছিলেন ,‘আমার শাস্তি হোক, তুমি সুখে থেকো। … আমি মিথ্যা বলি না। তুমিও (খাদিজা) সত্য কথা বলো।’

খাদিজা জানান, ঘটনার দিন পরীক্ষা শেষে তিনি হল থেকে বের হন। পরে বদরুল তাঁর হাত ধরে টেনে পুকুরের পাড়ে নিয়ে যান। সেখানে প্রথমে বদরুল তাঁকে চর মেরে মাটিতে ফেলে দেন। এর পরই চাপাতি দিয়ে প্রথমে তাঁর বাম হাতে কোপ দেন। আত্মরক্ষার চেষ্টা করলে আরো তিনটি কোপের আঘাতে তিনি জ্ঞান হারান।

ঠিক তখনই কিছু বলতে চাই বলে চিৎকার করে ওঠে বদরুল। উত্তেজিত বদরুল বিচারককে উদ্দেশ্য করে বলতে থাকে, আমি কিছু বলতে চাই। আমাকে সুযোগ দিন। আমি সত্য কথা বলবো। আমি একজন শিক্ষক ছিলাম, আমি বঙ্গবন্ধুর সৈনিক। এসময় বদরুলকে সতর্ক করে বিচারক সাইফুজ্জামান হিরো বলেন, আদালত বক্তৃতা দেওয়ার জায়গা নয়। বিচারকের কাছ থেকে অনুমতি না পেয়ে কাঠগড়ায় কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে বদরুল। সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে বিচারক মামলার যুক্তিতর্কের তারিখ ১ মার্চ ধার্য করেন।

ওই সময় ফের উত্তেজিত বদরুল চিৎকার করে  আবার বলে, ‘তুমি সুখী হও, খাদিজা। বিচারক আল্লাহ আছেন। আমার ফাঁসি হোক। তুমি আমার পরিবারকে পথে বসিয়েছ-মিথ্যাবাদী।’এসময় বদরুলের আইনজীবী ও উপস্থিত পুলিশ সদস্যরা তাকে নিবৃত্ত করে এজলাস থেকে বের করে নিয়ে যান।

খাদিজা হত্যাচেষ্টা মামলায় মোট ৩৭ সাক্ষীর মধ্যে খাদিজাসহ ৩৪ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ হয়েছিল।

এ সময় খাদিজার ওপর হামলার প্রতিবাদে ও ছাত্রলীগ নেতা বদরুল আলমের বিচার দাবিতে উত্তাল হয়ে উঠে গোটা সিলেট শহর। সরকারি মহিলা কলেজ, এমসি কলেজের শিক্ষার্থীরা দিনভর সড়ক অবরোধসহ নানা কর্মসূচি পালন করেন।

তিন দফা দাবির তুলেছিল শিক্ষার্থীরা :

১।মামলা দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর,

২।আসামি বদরুলের ফাঁসি নিশ্চিত করা,

৩।পরীক্ষার হল ও যাতায়াতের সময় ছাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

এ ঘটনায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছিলেন, সিলেটে কলেজছাত্রীকে কুপিয়ে জখম করার ঘটনায় অপরাধী যে দলেরই হোক, তাকে বিচারের কাঠগড়ায় নেওয়া হবে। বাংলাদেশ ছাত্রলীগ বদরুলকে সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়ে নিজেদের কেউ নন দাবি করে বলেছিল, বদরুলের দায় নেবে না সংগঠন।

৩ অক্টোবর ৩ টা ২১ মিনিটে ওই স্ট্যাটাসে তিনি লিখেন, ‘নিষ্ঠুর পৃথিবীর মানুষগুলোর কাছে আমি সবিনয়ে ক্ষমা প্রার্থী।’ এই স্ট্যাটাস দেওয়ার ঘণ্টা দেড়েক পরই এমসি কলেজ ক্যাম্পাসের পুকুর পাড়ে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর আহত করে খাদিজা আক্তার নার্গিসকে। ওই সময়ে অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের পরীক্ষা দিয়ে বের হয় খাদিজা। পরে আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও মঙ্গলবার ভোরে তাকে ঢাকায় এনে স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এরআগে সোমবার রাত সাড়ে ১২টা দিকে অ্যাম্বুলেন্সে করে তাকে নিয়ে ঢাকায় রওয়ানা হন পরিবারের সদস্যরা।

হামলাকারী বদরুল ইসলাম সুনামগঞ্জ জেলার ছাতক উপজেলার চেচানবাজারের সোনাইগাতি গ্রামের সাইদুর রহমানের ছেলে। ছাতকের নূতন বাজার বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় ও গোবিন্দগঞ্জ আবদুল হক স্মৃতি ডিগ্রী কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে সে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হয়। ২০০৮-২০০৯ শিক্ষাবর্ষের ছাত্র হিসেবে অনার্স শেষ করে। সে শাবি ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছে। পাশাপাশি আয়াজুর রহমান উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন।

কলেজে থাকাকালীন সময় থেকেই খাদিজা আক্তার নার্গিসের সঙ্গে তার প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠে। দীর্ঘ ৬ বছর তারা প্রেম করে। তৎকালীন সময় তাদের সম্পর্কে ভাঙ্গন দেখা দেয়। খাদিজা আক্তার নার্গিস এড়িয়ে চলতে শুরু করে বদরুলকে। এ নিয়ে উভয়ের মধ্যে মনোমালিন্যও ছিলো। গত ২৫ আগস্ট বদরুল আলম ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেয়। এতে উল্লেখ করে, ‘হৃদয়ের পার্লামেন্টে আজ স্পিকার নেই। মনের জনসভায় নেই কোনো বক্তা।

শেয়ার করুন