বাজারে পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৮৫ থেকে ৯০ টাকায়, ৪ লাখ ৭০ হাজার মেট্রিক টন পেঁয়াজের হদিস নেই!

বাংলা নিউজ ইউকে রিপোর্ট : কয়েক মাস আগে যে পেঁয়াজ কেনা গেছে ২০-৩০ টাকায়, সেই পেঁয়াজ এখন কিনতে হচ্ছে ৮৫ থেকে ৯০ টাকায়। বাজারে পেঁয়াজের এখন অনেক ঝাঁজ।ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাজারে পেঁয়াজের সংকট। চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ নেই। তাই দাম বেড়েছে। আবার ভারতেও পেয়াজের দাম বেশি। কিন্তু উৎপাদন, আমদানি ও মজুদ পরিস্থিতির সঙ্গে ব্যবসায়ী, বাজার পর্যবেক্ষক ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বক্তব্যের মিল খুঁজে পাওয়া যায় না।

বাজার ঘুরে দেখা গেছে, গতকাল রবিবার রাজধানীতে প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হয় ৮৫ থেকে ৯০ টাকায়। আমদানি করতে হয়েছে ৬৫ থেকে ৭০ টাকায়।হিসাবমতে গত কয়েকমাসের ব্যবধানে কেজিতে পেঁয়াজের দাম বেড়েছে ৪০ থেকে ৫০ টাকা। এর মধ্যে এক সপ্তাহের ব্যবধানে তিন দফায় দাম বেড়েছে ২০ থেকে ২৫ টাকা।

রবিবার ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ টিসিবির দৈনিক বাজার দরের তালিকায় দেখা গেছে, আমদানি করা পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৬০ থেকে ৭০ টাকা, যা এক সপ্তাহ আগে ছিল ৪৮ থেকে ৫৫ টাকা। আর এক মাস আগে ছিল ৩৫ থেকে ৪০ টাকা। সেক্ষেত্রে এক মাসের ব্যবধানে দাম বেড়েছে ৭৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ। বছরের তুলনায় দাম বেড়েছে ১৭০ দশমিক ৮৩ শতাংশ।

কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, দেশে প্রতি বছর পেঁয়াজের চাহিদা ২০ থেকে ২২ লাখ মেট্রিক টন। আর এ বছর দেশে পেঁয়াজ উৎপাদন হয়েছে ১৯ লাখ মেট্রিক টন। সে হিসেবে ঘাটতি থাকার কথা সর্বোচ্চ ৩ লাখ মেট্রিক টন।কিন্তু বছর শেষ হওয়ার বাকি আর দুই মাস। আর ১ জানুয়ারি থেকে ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত পেঁয়াজ আমদানি করা হয়েছে ৭ লাখ ৭০ হাজার ৮৭৫ মেট্রিক টন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসেব মতে, টতি মেটানোর পর নতুন ফসল ওঠার ২ মাস আগে এই মুহূর্তে দেশে পেঁয়াজ মজুদ থাকার কথা ৪ লাখ ৭০ হাজার ৮৪৫ মেট্রিক টন। অথচ ব্যবসায়ীরা বলছেন, এখনই বাজারে পেঁয়াজ নেই।

তাই বাজার পর্যবেক্ষণ ও ভোক্তাদের প্রশ্ন, তাহলে আমদানির বাড়তি ৪ লাখ ৭০ হাজার মেট্রিক টন পেঁয়াজ গেলো কোথায়?

এদিকে পেঁয়াজ নিয়ে উদ্ভব পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে সোমবার (৩০ অক্টোবর) দ্রব্যমূল্য পর্যালোচনা সংক্রান্ত আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব শামীমা ইয়াসমিনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে অর্থ মন্ত্রণালয়, কৃষি মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশন, বন্দর কর্তৃপক্ষ ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের প্রতিনিধিসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠকে উপস্থিত সংস্থাগুলোর প্রতিনিধির পর্যবেক্ষণে দেশের বাজারে পেঁয়াজের ঘাটতি থাকার কোনও তথ্য মেলেনি। কাজেই সংকটের অজুহাত ভিত্তিহীন। দেশে এই মুহূর্তে এখনও পর্যাপ্ত পেঁয়াজ মজুদ আছে। যা দিয়ে আরও ২/৩ মাস ভালোভাবে চলে যাওয়ার কথা। অবশ্য এর আগেই নতুন পেঁয়াজ বাজারে চলে আসবে।

একইসঙ্গে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের দু’টি টিম রাজধানীর দু’টি পাইকারি বাজার (শ্যামবাজার ও কাওরানবাজার) পরিদর্শন করেছেন।

বাজারে পেঁয়াজের সরবরাহ, মজুদ ও দামের বিষয়ে খোঁজ-খবর নিয়েছেন। তারাও বাজার পরিদর্শন করে মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন দাখিল করেছেন। সেখানেও একই চিত্র পাওয়া গেছে। পর্যবেক্ষণ টিমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাজারে পেঁয়াজের সরবরাহে স্বাভাবিক। পর্যাপ্ত মজুদও আছে। কোথাও সংকট দেখা যায়নি। এরপরও কেন পেঁয়াজের দাম বেড়েছে, জানতে চাইলে সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা কোনও কথা বলেননি।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দ্রব্যমূল্য পর্যালোচনা সংক্রান্ত কমিটির বৈঠকে উপস্থিত বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিনিধি জানিয়েছেন, ২০১৭ সালের জানুয়ারি মাসে দেশে ৪২ হাজার ৩৮২ টন, ফেব্রুয়ারি মাসে ৫২ হাজার ১১৭ টন, মার্চ মাসে ৬৫ হাজার ২৫৫ টন, এপ্রিল মাসে ৬২ হাজার ২২০ টন, মে মাসে ১ লাখ ৩ হাজার ৭১১ টন, জুন মাসে ১ লাখ ১৯ হাজার ৩৮৯ টন, জুলাই মাসে ১ লাখ ৩ হাজার ৫৯ টন, আগস্ট মাসে ১ লাখ ৩ হাজার ৯৫০ টন, সেপ্টেম্বর মাসে ৬৫ হাজার ৪৬২ টন ও ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত ৫৩ হাজার ৩৫৫ টন পেঁয়াজ আমদানি করা হয়েছে। সব মিলিয়ে যার পরিমাণ ৭ লাখ ৭০ হাজার ৮৪৫ টন। বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মকর্তা ওই বৈঠকে আরও জানান, এ পর্যন্ত ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানির লক্ষ্যে এলসি খোলার পরিমাণ ছিল ৮ লাখ ১৯ হাজার ৪৩ টনের।

এদিকে, বাজারে পেঁয়াজের দাম বাড়া নিয়ে রাজধানীর শ্যামবাজারের পাইকারি ব্যবসায়ী আরিফুল হক জানিয়েছেন, ‘ভারতে পেঁয়াজের দাম বেড়েছে। দেশে বৃষ্টিতে পেঁয়াজ নষ্ট হয়েছে। চাহিদা তো আর কমেনি। চাহিদা মতো পেঁয়াজের সরবরাহ নেই। তাই দাম বেড়েছে।’ বিষয়টিকে স্বাভাবিক নিয়ম বলেই মনে করেন আরিফুল হক।

অন্য আরেক ব্যবসায়ী বলেন, দেশের পেঁয়াজের বাজার ভারত থেকে আমদানির ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। ভারতের বাজারে পেঁয়াজের দাম বাড়েছে, তাই দেশেও এর প্রভাব পড়েছে। এছাড়া ভারতীয় পেঁয়াজের আমদানিও কমে গেছে। এ কারণে দেশের বাজারে পেঁয়াজের দাম একটু বাড়তি।

তিনি আরো বলেন, বাজারে পুরান পেঁয়াজ শেষের দিকে। নতুন করে আবাদ করা পেঁয়াজ এখনও কৃষকের জমিতে আছে। সেই নতুন পেঁয়াজ আসতে আরও কিছুদিন সময় লাগবে। তাই বাজারে দেশি পেঁয়াজের ঘাটতি রয়েছে, যার কারণে দাম একটু বাড়তির দিকে। নতুন পেঁয়াজ এলেই দাম আবার কমতে থাকবে।

অন্যদিকে পুরান ঢাকার মৌলভীবাজারের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাজারে দেশি পেঁয়াজ আছে, তবে তা পর্যাপ্ত নয়। দেশি পেঁয়াজের পর্যাপ্ত সরবরাহ নেই, তাই দাম একটু বাড়তির দিকে।

জানতে চাইলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব শামীমা ইয়াসমিন জানান, ‘কমিটির পর্যবেক্ষণে এই মুহূর্তে দেশে পেঁয়াজের কোথাও কোনও সংকট নেই। মজুদও ভালো। তারপরও দেশের বাজারগুলোয় পেঁয়াজের মূল্যবৃদ্ধি সন্দেহজনক। কাজেই মনিটরিংয়ের প্রয়োজন হওয়ায় আমরা কমিটির পক্ষ থেকে ওপর মহলে অভিমত দাখিল করেছি। বাজারে কঠোর মনিটরিং বাড়ানো উচিত বলে জানিয়েছি। পেঁয়াজের মূল্যবৃদ্ধি সম্পূর্ণ অযৌক্তিক বলেও কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ভারতেও বেড়েছে পেঁয়াজের দাম। সেখানেও বৃষ্টিতে উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। তবে ভারতে পেঁয়াজের দাম এতটা বাড়েনি। একসপ্তাহ আগে ভারতে প্রতিটন পেঁয়াজ ২৭১ মার্কিন ডলার দরে বিক্রি হলেও ২৭ অক্টোবর সেখানে বিক্রি হয়েছে ৩৪১ মার্কিন ডলার দরে।

সূত্রে জানা যায়, রবিবার হঠাৎ করেই থেকে পেঁয়াজের এলসি মূল্য টনপ্রতি ২০০ ডলার বাড়িয়ে দিয়েছে ভারতীয় ব্যবসায়ীরা। পাশাপাশি দিনাজপুরের হিলি স্থলবন্দর দিয়ে কমেছে ভারত থেকে পেঁয়াজের আমদানি। এ অবস্থায় হিলি স্থলবন্দরের পাইকারি বাজারে দু’দিনের ব্যবধানে পেঁয়াজের দাম বেড়েছে কেজিপ্রতি ১২ থেকে ১৪ টাকা।

হিলি স্থলবন্দরের পেঁয়াজ আমদানিকারক বাবলুর রহমান বাবলু জানান, দফায় দফায় পেঁয়াজের এলসি মূল্য বাড়িয়ে এক সপ্তাহ আগে টনপ্রতি ৪০০ থেকে ৫০০ ডলারে উন্নীত করে ভারতের পেঁয়াজ রফতানিকারকরা। রোববার হঠাৎ করেই ভারতের ব্যবসায়ীরা পেঁয়াজের এলসি মূল্য ৫০০ ডলার থেকে ৭০০ ডলারে উন্নীত করে।

এদিকে, কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, দেশে বর্তমানে তাহেরপুরি, বারি পেঁয়াজ-১ (তাহেরপুরি), বারি পেঁয়াজ-২ (রবি মৌসুম), বারি পেঁয়াজ-৩ (খরিপ মৌসুম), স্থানীয় জাত ও ফরিদপুরি জাতের পেঁয়াজ উৎপাদন করা হয়। ফলে বছরজুড়েই কোনও না কোনও জাতের পেঁয়াজ উৎপাদন হয়। এ কারণে নির্দিষ্ট কোনও মৌসুমে এসে পেঁয়াজের সরবরাহ হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কা কম।

শেয়ার করুন