ব্রিটেনে অবৈধদের বৈধতা দিতে পিটিশন

যুক্তরাজ্যে কমপক্ষে ১০ বছর ধরে বসবাস করছেন এমন ব্যক্তিদের মধ্যে যারা অবৈধ হয়ে পড়েছেন তাদেরকে বৈধতা দেয়ার জন্য জোরালো দাবি উঠেছে। বাংলাদেশি বিভিন্ন সংগঠনের পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব মানবাধিকার সংগঠনের পক্ষ থেকে এই দাবি উঠছে। বিশেষ করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বরিস জনসন সম্প্রতি মন্ত্রীসভার বৈঠকে ১০ বছর ধরে বসবাস করা অবৈধ অভিবাসীদের বৈধতা দেয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা আহবান জানালো বহুদিনের এই দাবি জোরালো হয়।
স্টিভ পার্কার নামে এক ব্যক্তি ইতিমধ্যে এই দাবিতে একটি পিটিশন চালু করেছেন। পিটিশনের পক্ষে সমর্থন চেয়ে তিনি বলেছেন, যুক্তরাজ্যে যারা ১০ বছর বা তার বেশি সময় ধরে বসবাস করছেন, এমন অবৈধ ব্যক্তিদের বৈধতা দেয়ার বিষয়টি দেশের অর্থনীতির জন গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, যুক্তরাজ্য ইউরোপিয় ইউনিয়ন ছাড়ার প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। অবৈধ ইমিগ্রেন্টরা বৈধতা পেলে ব্রেক্সিট পরবর্তী সময়ে দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারবেন।
গত মঙ্গলবার এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ২৮ হাজার ২২২ জন লোক এই পিটিশনে সাক্ষর করেছে। এক লাখ ব্যক্তির সমর্থন পেলে পিটিশনটি বিবেচনায় নিতে বাধ্য সরকার। এ নিয়ে সংসদে বিতর্ক হবে এবং বিষয়টিতে সরকার একটি সিদ্ধান্ত জানাবে। ব্রিটিশ পার্লামেন্টের ওয়েবসাইটে চালু করা এই পিটিশনে যে কেউ সমর্থন জানিয়ে সাক্ষর করতে পারবেন।
বাংলাদেশি কমিউনিটির বিভিন্ন তরফ থেকে এই পিটিশনে সাক্ষরের জন্য আহবান জানিয়ে প্রচারণা চলছে। বাংলাদেশি রেস্টুরেন্ট মালিকদের সংগঠন বিসিএ এই দাবির প্রতি সমর্থন দিয়েছে। সংগঠনটির নেতৃবৃন্দ সম্প্রতি এক সভায় ১০ বছর ধরে থাকা অবৈধ ইমিগ্রেন্টদের বৈধতা দিতে সরকারের প্রতি আহবান জানান।
ব্রিটেনে ঠিক কত সংখ্যক লোক অবৈধ উপায়ে বসবাস করছে তার সঠিক কোনো হিসাব কোনো কর্তৃপক্ষের কাছে নেই। ধারণা করা হয় এই সংখ্যা কয়েক লাখ হবে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাংলাদেশিও আছেন বলে ধারণা।
https://petition.parliament.uk/petitions/218729
রেস্টুরেন্ট খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘদিন যাবত ইমিগ্রেশন আইনের কড়াকড়ির কারণে বাংলাদেশ থেকে রেস্টুরেন্ট কর্মী আসা বন্ধ। এ অবস্থায় অবৈধ ইমিগ্রেন্টদের যদি বৈধতা দেয়া হয়, তবে তারা রেস্টুরেন্ট খাতের স্টাফ সংকট নিরসনে ভূমিকা রাখতে পারেন।
বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী বরিস জনসন লন্ডন মেয়র থাকার সময়ে অবৈধদের বৈধতা দেয়ার দাবি তোলেন। সম্প্রতি মন্ত্রীসভার বৈঠকে তিনি একই দাবি উত্থাপন করেন। জনসন বলেন, উইন্ডরাশ কেলেঙ্কারির ফলে সরকার যে শুদ্ধি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, তার পরিসর আরও ব্যাপক হওয়া উচিত। তিনি বলেন, ১০ বছর ধরে ব্রিটেনে আছেন এমন অবৈধ ইমিগ্রেন্টদের মধ্যে যারা আইন ভঙ্গ করেননি তাদের বৈধতা দেয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত। জনসনের মতে, এসব ব্যক্তি এমনিতেই যুক্তরাজ্যে আছে। তাদের যদি সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে বৈধতা দেয়া হয় তাহলে অর্থনীতিতে আনুষ্ঠানিক অবদান রাখতে সক্ষম হবে।
উইন্ডরাশ কেলেঙ্কারির ঘটনায় থেরেসা মের সরকার এখন তাঁর বিতর্কিত অভিবাসন নীতি নিয়ে বেশ চাপে আছে। অবৈধদের বৈধতা দেয়ার দাবি তোলার জন্য এখনই মোক্ষম সময় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ঠিকমত গুরুত্ব দিয়ে দাবি তোলা গেলে এখন এই দাবি আদায় করা সম্ভব। চাপে পড়ে সরকার ইতিমধ্যে ইমিগ্রেশন আইনের বিতর্কিত দুটি বিষয় বাদ দিতে বাধ্য হয়েছে। গত মঙ্গলবার (১৫ মে) নব নিযুক্ত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী (হোম সেক্রেটারি) সাজিদ জাভিদ জানিয়েছেন, অবৈধ অভিবাসীদের ব্যাংক হিসাব বন্ধ করার যে নিয়ম চালু করা হয়েছিল-সেটি স্থগিত করা হয়েছে। গত জানুয়ারি থেকে চালু হওয়া ওই নিয়মের কারণে অভিবাসন বিভাগের প্রদান করা তালিকা দেখে অবৈধদের ব্যাংক হিসাব বন্ধ করতে হতো ব্যাংকগুলোকে।
এর আগে জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ (এনএইচএস) এবং অভিবাসন বিভাগের (হোম অফিস) মধ্যকার বিতর্কিত চুক্তিটি বাতিল ঘোষণা করা হয়। ওই চুক্তির আওতায় অভিবাসন বিভাগ অবৈধ অভিবাসীরা চিকিৎসা নিচ্ছে কি-না, সেটি নজরদারি করতো। স্বাস্থ্যবিভাগের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে সম্ভাব্য অবৈধ অভিবাসীদের অবস্থান চি?িত করে তাদের পাকড়াও করতো।
দেশটির বর্তমান প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময়ে এসব বিতর্কিত নিয়ম প্রণয়ন করেছিলেন। অবৈধ অভিবাসীরা যাতে যুক্তরাজ্যে বসবাস করতে না পারে সেজন্য তিনি বাসা ভাড়া, চিকিৎসা, চাকরি, ব্যাংক হিসাব খোলাসহ যাবতীয় কাজে অভিবাসনের বৈধতা যাচাইয়ের নিয়ম বাধ্যতামূলক করেন। তাঁর চালু করা অভিবাসন নীতির মূল্য লক্ষ্যই ছিল অবৈধদের জন্য ‘বৈরি পরিবেশ’ সৃষ্টি করা। যাতে অবৈধরা বাঁচার উপায় না পেয়ে নিজ থেকেই যুক্তরাজ্য ছাড়ে।
থেরেসা মে’র ওইসব বিতির্কিত নিয়মের কারণে যুক্তরাজ্যে দশকের পর দশক ধরে বসবাস করছেন- এমন অনেকেই অবৈধ হিসেবে চি?ত হন এবং চরম ভোগান্তিতে পড়েন। উইন্ডরাশ কেলেঙ্কারি নামে পরিচতি এই ঘটনা যুক্তরাজ্যের বিতর্কিত অভিবাসন নীতির অমানবিকতা ও নিষ্ঠুরতাকে সামনে নিয়ে আসে।
উইন্ডরাশ কেলেঙ্কারির খত সামাল দিতে সরকার গত এক সপ্তাহে দুটি বিতর্র্কিত নিয়ম বাদ দিল। গত মঙ্গলবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রনালয় বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সামনে প্রথমবারের মত হাজির হন নব নিযুক্ত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাজিদ জাভিদ। তিনি বলেন, উইন্ডরাশ কেলেঙ্কারি থেকে দেখা গেছে, ভুলবশত অনেক বৈধ নাগরিক অবৈধ হিসেবে চি?ত হয়েছেন। অবৈধদের ব্যাংক হিসাব বন্ধের ক্ষেত্রেও একই ঝুঁকি রয়েছে। তাই নিয়মটি ইতিমধ্যে স্থগিত করেছেন তিনি। সাজিদ জাভিদ অভিবাসন নীতিকে ন্যায়সঙ্গত করে ঢেলে সাজানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। উইন্ডরাশ কেলেঙ্কারির জের ধরে ইতিমধ্যে অবৈধ অভিবাসী বিতাড়ের গোপন লক্ষ্যও (টার্গেট) বাদ দিয়েছে সরকার।
এদিকে, মাইগ্রেশন এডভাইজরি কমিটি এতদিন বিদেশি সহপাঠীদের বিষয়ে স্থানীয় শিক্ষার্থীদের মতামত চেয়ে একটি জরিপ চালাতো। ওই জরিপকে অনৈতিক আখ্যা দিয়ে বাতিল ঘোষণা করেছে যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটিগুলোর সংগঠন ‘ইউনিভার্সিটি ইউকে’। মাইগ্রেশন এডভাইজরি কমিটি সরকারের স্বরাষ্ট্র বিভাগকে অভিবাসন নীতি প্রনয়নে পরামর্শ দেয়। বিতর্কিত অভিবাসন নীতিগুলোর বিষয়ে সংগঠনটির সমর্থন ছিল। ইউনিভার্সিটি ইউকে’র পক্ষ থেকে বলা হয়, ওই জরিপে মারাত্মক ত্রুটি আছে। স্থানীয় শিক্ষার্থীরা তাদের অশেতাঙ্গ সকল সহপাঠীকে বিদেশি শিক্ষার্থী বলে ধরে নিতে পারে। অথচ অশেতাঙ্গ অনেকেই ব্রিটিশ নাগরিক। তাছাড়া বিদেশি শিক্ষার্থীদের প্রতি যেসব স্থানীয় শিক্ষার্থী বিরূপ মনোভাব পোষণ করে, তারাই জরিপে বেশি বেশি অংশ নেয়। সবমিলিয়ে জরিপটির উদ্দেশ্য বিদেশি শিক্ষার্থীদের ভিন্ন চোখে দেখা। তাই ইউনিভার্সিটিগুলো মাইগ্রেশন এডভাইজরি কমিটির এই জরিপের কাজে আর থাকছে না।
মাইগ্রেশন এডভাইজরি কমিটি বলেছে, বিদেশি শিক্ষার্থীদের প্রতি বৈষম্য করা জরিপের উদ্দেশ্য নয়। তবে জরিপটির কাজ ইতিমধ্যে গুটিয়ে নেয়া হয়েছে বলে তারা স্বীকার করে।

শেয়ার করুন